পরিপূর্ণ সুরক্ষা ও সফলতা পেতে— আল্লাহ তাআলার দিকে-ই ফিরে আসা ।
অসুস্থতা” বিপদ, জাদু” নজর, জিন” শয়তান, চিকিৎসা— রুকইয়াহ সহ সকল বিষয় সঠিকভাবে বুঝতে হলে প্রথমেই একটি মৌলিক আকীদা অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে:
আল্লাহ তাআলাই সবকিছুর স্রষ্টা, মালিক ও সর্বশক্তিমান। কোনো সৃষ্টিই আল্লাহ তাআলার সমকক্ষ নয়। মানুষ, জিন ও শয়তানসহ কোনো সৃষ্টিই আল্লাহ তাআলার ক্ষমতার বাইরে নয়। জাদু ও রোগের কোনো প্রভাবই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও অনুমতির বাইরে কার্যকর হতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ﴾
উচ্চারণ:
ওয়া হুওয়া ‘আলা কুল্লি শাইইন কাদীর।
অর্থ:
“আর তিনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।”
কুরআনের বহু স্থানে আল্লাহ তাআলা নিজের পূর্ণ ক্ষমতার কথা ঘোষণা করেছেন।
আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও ক্ষমতার বাইরে কোনো সৃষ্টি, কোনো ঘটনা, কোনো রোগ, কোনো বিপদ, কোনো জিন বা কোনো জাদু —কোনো শয়তানের স্বাধীন ক্ষমতা নেই। এই বিশ্বাস অন্তরে দৃঢ়ভাবে ধারণ করুন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করুন।
১. আল্লাহ তাআলাই সবকিছুর মালিক ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ﴾
উচ্চারণ:
তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল-মুলকু, ওয়া হুওয়া ‘আলা কুল্লি শাইইন কাদীর।
অর্থ:
“বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে রাজত্ব; আর তিনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।”
— সূরা আল-মুলক, ৬৭:১
অতএব মানুষ, জিন, ফেরেশতা, শয়তান, রোগ, সুস্থতা, জীবন, মৃত্যু, সম্পদ, দারিদ্র্য—সবই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি এবং তাঁর কর্তৃত্বাধীন।
এ কারণে একজন মুমিন কোনো সৃষ্টিকে এমনভাবে ভয় করবে না, যেন সেই সৃষ্টি আল্লাহ তাআলার ক্ষমতার বাইরে নিজের স্বাধীন শক্তিতে কিছু করতে পারে।
২. বিপদও আল্লাহ তাআলার জ্ঞানের বাইরে নয় ।
মানুষের জীবনে সুখ যেমন আসে, তেমনি দুঃখও আসে। সুস্থতা যেমন আসে, তেমনি অসুস্থতাও আসে। সম্পদ যেমন আসে, তেমনি কখনো সম্পদের ক্ষতিও হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ﴾
উচ্চারণ:
ওয়া লানাবলুওয়ান্নাকুম বিশাইইন মিনাল-খাওফি ওয়াল-জূ‘ই, ওয়া নাকসিম মিনাল-আমওয়ালি ওয়াল-আনফুসি ওয়াস-সামারাত; ওয়া বাশ্শিরিস-সাবিরীন।
অর্থ:
“আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫
লক্ষ করুন, আল্লাহ তাআলা বলেননি যে মুমিনের জীবনে কোনো পরীক্ষা থাকবে না। বরং আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ভয়, ক্ষুধা, সম্পদের ক্ষতি, জীবনহানি ও অন্যান্য কষ্টের মাধ্যমে পরীক্ষা আসতে পারে।
অতএব বিপদ আসা মানেই ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে—এমন নয়। বরং বিপদের সময় বান্দার অবস্থানই প্রকাশ করে সে কীভাবে আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে যায়।
৩. ঈমানের দাবি করলেই কি পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়?
না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ﴾
উচ্চারণ:
আহাসিবান-নাসু আইয়্যুতরাকূ আইয়্যাকূলূ আমান্না ওয়াহুম লা ইউফতানূন।
অর্থ:
“মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদেরকে আর পরীক্ষা করা হবে না?”
— সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:২
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ﴾
অর্থ:
“আর অবশ্যই আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি। অতএব আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী।”
— সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৩
এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে।
পরীক্ষা মানে এই নয় যে আল্লাহ তাআলা আগে জানতেন না, পরীক্ষা করে পরে জানতে পারলেন। আল্লাহ তাআলার জ্ঞান সর্বপূর্ণ। বরং পরীক্ষা মানুষের বাস্তব অবস্থান ও আমলকে প্রকাশ করে দেয় এবং তার ওপর হুজ্জত প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪. আল্লাহ তাআলা ভালো ও মন্দ—উভয় দিয়েই পরীক্ষা করেন ।
পরীক্ষা শুধু রোগ, দারিদ্র্য বা বিপদের মাধ্যমে হয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَنَبْلُوكُم بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ﴾
উচ্চারণ:
ওয়া নাবলূকুম বিশ-শাররি ওয়াল-খাইরি ফিতনাতান, ওয়া ইলাইনা তুরজা‘ূন।
অর্থ:
“আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো উভয় দ্বারা পরীক্ষা করি; আর তোমাদেরকে আমার কাছেই ফিরিয়ে আনা হবে।”
— সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩৫
এখানে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে।
দারিদ্র্য যেমন পরীক্ষা — সম্পদও পরীক্ষা।
অসুস্থতা যেমন পরীক্ষা — সুস্থতাও পরীক্ষা।
দুঃখ যেমন পরীক্ষা — সুখও পরীক্ষা।
ক্ষতি যেমন পরীক্ষা — প্রাপ্তিও পরীক্ষা।
তাই শুধু বিপদের সময় নয়, সুখের সময়ও আল্লাহ তাআলার প্রতি বান্দার আনুগত্য পরীক্ষা হয়।
৫. বিপদ কি সবসময় শাস্তি?
না।
এখানে আমাদের আগের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করতে হবে।
কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলেই বলা যাবে না—
“আল্লাহ তাআলা তাকে শাস্তি দিচ্ছেন।”
আবার কেউ বিপদে পড়লেই বলা যাবে না—
“এটি নিশ্চিতভাবে তার কোনো গুনাহের শাস্তি।”
কারণ কুরআন ও সুন্নাহ দেখায় যে বিপদের বিভিন্ন কারণ ও বিভিন্ন হিকমত থাকতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ﴾
উচ্চারণ:
ওয়া মা আসাবাকুম মিন মুসীবাতিন ফাবিমা কাসাবাত আইদীকুম, ওয়া ইয়াফূ ‘আন কাসীর।
অর্থ:
“তোমাদের ওপর যে বিপদই আসে, তা তোমাদের হাতের অর্জনের কারণে; আর আল্লাহ অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।”
— সূরা আশ-শূরা, ৪২:৩০
এই আয়াত দেখায় যে মানুষের কিছু বিপদ তার নিজের কাজের ফল হতে পারে।
কিন্তু একই সঙ্গে কুরআন আমাদের জানায়—আল্লাহ তাআলা মুমিনদের পরীক্ষাও করেন।
সুতরাং কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নির্দিষ্ট বিপদ দেখে নিশ্চিতভাবে বলা—
“এটি আল্লাহর শাস্তি”
—সঠিক নয়, যদি শরিয়তে তার ব্যাপারে স্পষ্ট প্রমাণ না থাকে।
৬. তাহলে বিপদের উদ্দেশ্য কী?
বিপদের উদ্দেশ্য এক কথায় নির্ধারণ করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা তাঁর হিকমত অনুযায়ী বিভিন্ন কারণে বান্দাকে পরীক্ষা করেন।
তবে কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক শেখায়:
১. ঈমানের পরীক্ষা
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, মানুষ ঈমানের দাবি করলেই পরীক্ষা ছাড়া ছেড়ে দেওয়া হবে না।
২. সবরের পরীক্ষা
আল্লাহ তাআলা বিপদের কথা উল্লেখ করে বলেছেন—“ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।”
৩. আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ
বিপদের সময় মানুষ নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া, সাহায্য ও আশ্রয়ের দিকে ফিরে আসে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ﴾
উচ্চারণ:
ওয়াস্তাঈনূ বিস-সাবরি ওয়াস-সালাহ; ইন্নাল্লাহা মা‘আস-সাবিরীন।
অর্থ:
“তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩
অতএব বিপদে মুমিনের পথ হলো—আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং আল্লাহ তাআলার দিকে আরও বেশি ফিরে আসা।
৭. বিপদে আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসা ।
আল্লাহ তাআলা বিপদগ্রস্ত মুমিনের একটি সুন্দর পরিচয় দিয়েছেন।
﴿الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ﴾
উচ্চারণ:
আল্লাযীনা ইযা আসাবাতহুম মুসীবাতুন কালূ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘ঊন।
অর্থ:
“যখন তাদের ওপর কোনো বিপদ আসে, তখন তারা বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৬
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿أُولَٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ﴾
অর্থ:
“তাদের ওপরই তাদের রবের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং তারাই সঠিক পথে পরিচালিত।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৭
অতএব বিপদে “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘ঊন” বলা শুধু একটি বাক্য নয়; এটি একজন মুমিনের আকীদা ও আত্মসমর্পণের প্রকাশ।
৮. বিপদে মুমিনের প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণের হতে পারে ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ»
উচ্চারণ:
‘আজাবান লি-আমরিল-মু’মিন, ইন্না আমরাহু কুল্লাহু খাইর, ওয়া লাইসা যালিকা লি-আহাদিন ইল্লাল-মু’মিন। ইন আসাবাতহু সাররা-উ শাকারা ফাকানা খাইরান লাহু, ওয়া ইন আসাবাতহু দররা-উ সাবারা ফাকানা খাইরান লাহু।
অর্থ:
“মুমিনের বিষয়টি কতই না আশ্চর্য! তার সব অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর, আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়। তার কাছে আনন্দের কিছু এলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে—এটি তার জন্য কল্যাণকর। আর তার ওপর কোনো কষ্ট এলে সে ধৈর্য ধারণ করে—এটিও তার জন্য কল্যাণকর।”
— সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯৯
এখানে রুকইয়াহর পাঠকের জন্য অসাধারণ একটি শিক্ষা রয়েছে।
অসুস্থ হলে—আল্লাহর দিকে ফিরুন।
সুস্থ হলে—আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন।
বিপদে পড়লে—সবর করুন।
সুখ পেলে—পরিপূর্ণ শুকরিয়া আদায় করুন।
তাহলেই জীবনের উভয় অবস্থাই মুমিনের জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে।
৯. বিপদের সময় আল্লাহ তাআলা কী চান?
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিপদের সময় বান্দার করণীয় হলো—
সবর → সালাত → দোয়া → তাওবা → আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল → বৈধ উপায় গ্রহণ → আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩
আর ধৈর্যশীলদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ﴾
অর্থ:
“নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার— অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।”
— সূরা আয-যুমার, ৩৯:১০
অতএব বিপদের সময় মুমিনের লক্ষ্য শুধু “কীভাবে দ্রুত বিপদ থেকে বের হব”—এতটুকু নয়; বরং—
“এই পরিস্থিতিতে আমি কীভাবে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করব?”
এই প্রশ্নটিও করতে হবে।
১০. বিপদ মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দিতে পারে ।
এখানে খুব সুন্দর একটি ভারসাম্য বুঝতে হবে।
বিপদকে শুধু কষ্ট হিসেবে দেখলে মানুষ হতাশ হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু ঈমানের চোখে বিপদ মানুষকে কয়েকটি সত্য উপলব্ধি করিয়ে দিতে পারে—
আমি দুর্বল।
আমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।
আমার প্রয়োজন আল্লাহ তাআলার।
আমার জীবন আল্লাহ তাআলার হাতে।
আমার ফিরে যাওয়ার স্থান আল্লাহ তাআলার কাছেই।
এই কারণেই বিপদের সময় একজন মুমিনের দোয়া, সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, তাওবা, যিকির ও তাওয়াক্কুল আরও গভীর হতে পারে।
তবে এটিকে এমনভাবে বলা যাবে না যে প্রত্যেক বিপদ অবশ্যই আল্লাহ তাআলা শুধু এই একটি উদ্দেশ্যেই দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার হিকমত ব্যাপক; কুরআন আমাদের জানায়—কখনো পরীক্ষা, কখনো মানুষের কাজের ফল, আবার মুমিনের জন্য সেই বিপদ সবর ও সওয়াবের কারণ হতে পারে।
১১. রুকইয়াহর সঙ্গে এই আকীদার সম্পর্ক ।
এখন আমরা বুঝতে পারি, রুকইয়াহ কেন কেবল কিছু আয়াত পড়ার নাম নয়।
একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে রুকইয়াহ করেন, তখন তাঁর অন্তরে থাকবে—
“আমি অসুস্থ; কিন্তু আমার রব সর্বশক্তিমান।”
জাদুর আশঙ্কা হলে—
“আমি ভীত হতে পারি; কিন্তু আমার রব আমার চেয়ে অসীম শক্তিশালী।”
নজরের আশঙ্কা হলে—
“নজর সত্য হতে পারে; কিন্তু আমি আল্লাহ তাআলার আশ্রয়েই থাকব।”
জিনের ব্যাপারে ভয় হলে—
“জিন আল্লাহর সৃষ্টি; আল্লাহ তাআলা সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।”
চিকিৎসা গ্রহণ করলে—
“চিকিৎসা একটি মাধ্যম; শিফা দেবেন আল্লাহ তাআলা।”
আর দীর্ঘদিন কোনো পরীক্ষা চললে—
“আমি জানি না এই পরীক্ষার পূর্ণ হিকমত কী; কিন্তু আমি আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান, সবর ও তাওয়াক্কুল ছাড়ব না।”
এটাই একজন মুমিনের শক্তি।
১২. বিপদে মুমিনের পথ ।
বিপদ এলো
↓
হতাশ না হয়ে আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে যাওয়া
↓
“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘ঊন” বলা
↓
সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া
↓
দোয়া ও রুকইয়াহ করা
↓
প্রয়োজনীয় বৈধ চিকিৎসা গ্রহণ করা
↓
নিজের ভুল থাকলে তাওবা ও সংশোধন করা
↓
আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুল রাখা
↓
পরীক্ষায় ঈমান ও আমল দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করা
এই পথই রুকইয়াহর আলোচনাকে শুধু “রোগ সারানোর পদ্ধতি” থেকে বের করে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের একটি গভীর শিক্ষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৩. ধৈর্যধারণকারীদের জন্য আল্লাহর সুসংবাদ ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُولَٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ﴾
উচ্চারণ:
ওয়া বাশশিরিস-সাবিরীন। আল্লাযীনা ইযা আসাবাতহুম মুসীবাতুন ক্বালূ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। উলা-ইকা আলাইহিম সালাওয়াতুম মির রব্বিহিম ওয়া রহমাহ; ওয়া উলা-ইকা হুমুল মুহতাদূন।
অর্থ:
“আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা তাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হলে বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’ তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত এবং তারাই সঠিক পথপ্রাপ্ত।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫–১৫৭
মূল শিক্ষা
বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর ওপর ভরসা করলে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ, রহমত ও হিদায়াত লাভের সুসংবাদ রয়েছে।
১৪. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾
অর্থ:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।”
— সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩
১৫. ডাক ও সাহায্য একমাত্র আল্লাহর কাছে ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿قُلْ إِنَّمَا أَدْعُو رَبِّي وَلَا أُشْرِكُ بِهِ أَحَدًا﴾
অর্থ:
“বলুন, আমি তো শুধু আমার রবকেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করি না।”
— সূরা আল-জিন্ন, ৭২:২০
এই আয়াত রুকইয়াহর ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে:
ডাক আল্লাহর কাছে, আশ্রয় আল্লাহর কাছে, সাহায্য আল্লাহর কাছে।
১৬. জিন ও মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ।
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ﴾
উচ্চারণ:
ওয়া মা খালাকতুল-জিন্না ওয়াল-ইনসা ইল্লা লিয়া‘বুদূন।
অর্থ:
“আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।”
— সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬
১৭. কুরআন মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ ۙ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا﴾
উচ্চারণ:
ওয়া নুনাযযিলু মিনাল-কুরআনি মা হুয়া শিফাউঁ ওয়া রহমাতুল্লিল-মু’মিনীন; ওয়া লা ইয়াযীদুয-যালিমীনা ইল্লা খাসারা।
অর্থ:
“আর আমি কুরআনে এমন কিছু নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত; কিন্তু তা জালিমদের ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না।”
— সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮২
শেষ কথা ।
মুমিনের জীবনে বিপদ এলে তার প্রথম প্রশ্ন শুধু—
“কেন আমার সঙ্গে এমন হলো?”
হওয়া উচিত নয়।
বরং সে নিজেকে জিজ্ঞেস করবে—
“এই অবস্থায় আমার রব আমার কাছ থেকে কী চান?”
হয়তো এই বিপদের মাধ্যমে তাকে সবর শিখতে হবে।
হয়তো সালাতের দিকে আরও গভীরভাবে ফিরতে হবে।
হয়তো তাওবা করতে হবে।
হয়তো আল্লাহ তাআলার ওপর নির্ভরতা আরও দৃঢ় করতে হবে।
হয়তো কোনো ভুল থেকে ফিরে আসতে হবে।
হয়তো এই পরীক্ষার মধ্যেই তার জন্য এমন সওয়াব রয়েছে, যা সে অন্যভাবে অর্জন করতে পারত না।
তবে আমরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নির্দিষ্ট বিপদ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অদৃশ্য সিদ্ধান্ত ঘোষণা করব না। আমরা শুধু কুরআন ও সুন্নাহর নিশ্চিত শিক্ষা অনুসরণ করব।
আল্লাহ তাআলা পরীক্ষা করেন।
মুমিনকে সবর করতে বলেন।
বিপদের সময় আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে যাওয়ার শিক্ষা দেন।
সবরকারীদের জন্য মহান পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন।
আর মুমিন বিপদে সবর করলে সেই বিপদও তার জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে। — সহিহ মুসলিম ২৯৯৯
তাই রুকইয়াহর পাঠকের অন্তরে শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বাসটি প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত—
“আমার বিপদ আমার রবের ক্ষমতার বাইরে নয়।
আমার রোগ আমার রবের জ্ঞানের বাইরে নয়।
আমার ভয় আমার রবের অজানা নয়।
আমার দোয়া আমার রবের অগোচরে নয়।
আমি বৈধ উপায় গ্রহণ করব, কুরআন ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য চাইব, প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণ করব, নিজের ভুল হলে তাওবা করব, বিপদে সবর করব এবং সর্বাবস্থায় আমার রব আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুল রাখব।”
এটাই রুকইয়াহর অন্তরের শক্তি—ভয়ের কেন্দ্র থেকে মানুষকে সরিয়ে আল্লাহ তাআলার ওপর পূর্ণ নির্ভরতার দিকে নিয়ে যাওয়া।