ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক, আসমান ও জমিনের মালিক, জীবন ও মৃত্যুর অধিপতি এবং সকল রোগ ও আরোগ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক। আমরা আল্লাহরই ইবাদত করি, আল্লাহরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি এবং আল্লাহরই উপর পূর্ণ ভরসা রাখি। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর, যিনি মানব-জাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ, রহমত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ রাসুল।

মানুষের জীবনে সুস্থতা আল্লাহ তাআলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। সুস্থ শরীর, সুস্থ মন ও নিরাপদ জীবনব্যবস্থা ছাড়া মানুষ তার দীনী ও দুনিয়াবি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে না। তাই ইসলাম শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেয়নি; বরং পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যাভ্যাস, রোগ প্রতিরোধ, চিকিৎসা গ্রহণ এবং সুস্থ জীবনযাপনেরও পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।

এই মৌলিক সত্যটি আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তাঁর প্রিয় নবী ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বর্ণনা করেছেন—

আল-কুরআন

﴿وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ﴾

উচ্চারণ: ওয়া ইযা মারিদতু ফাহুয়া ইয়াশফীন

অর্থ: আর যখন আমি অসুস্থ হই, তখন তিনিই (আল্লাহ) আমাকে আরোগ্য দান করেন

সূরা: আশ-শু’আরা
আয়াত: ৮০

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

এই আয়াতটি নবী ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সেই বক্তব্যের অংশ, যেখানে তিনি তাঁর রবের পরিচয় বর্ণনা করছেন। তিনি ঘোষণা করছেন যে, অসুস্থতা মানুষের জীবনে আসতে পারে; কিন্তু প্রকৃত আরোগ্য একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে। এই আয়াত ইসলামী চিকিৎসা-দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করে—চিকিৎসা গ্রহণ করা হবে, কিন্তু অন্তর বিশ্বাস করবে যে শিফা একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।

সহিহ হাদিস

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন—

«تَدَاوَوْا عِبَادَ اللَّهِ، فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً»

অর্থ: “হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার জন্য তিনি কোনো চিকিৎসা নির্ধারণ করেননি।”

সূত্র: সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৮৫৫ (সহিহ); জামে আত-তিরমিযি, হাদিস নং ২০৩৮।

রাসুলুল্লাহ -এর আমল

আলী ইবনু আবি তালিব (রা.) থেকে একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে একটি বিচ্ছু দংশন করলে তিনি দংশিত স্থানে পানি ও লবণ ব্যবহার করেন এবং একই সঙ্গে মু‘আউয়িযাতাইন (সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস) দ্বারা রুকইয়াহ করেন।

হাদিসের আরবি متن

لَدَغَتِ النَّبِيَّ عَقْرَبٌ وَهُوَ يُصَلِّي، فَلَمَّا فَرَغَ قَالَ: لَعَنَ اللَّهُ الْعَقْرَبَ، لَا تَدَعُ مُصَلِّيًا وَلَا غَيْرَهُ، ثُمَّ دَعَا بِمِلْحٍ وَمَاءٍ، فَجَعَلَهُ فِي إِنَاءٍ، ثُمَّ جَعَلَ يَصُبُّهُ عَلَى إِصْبَعِهِ حَيْثُ لَدَغَتْهُ، وَيَمْسَحُهَا، وَيُعَوِّذُهَا بِالْمُعَوِّذَتَيْنِ.

বাংলা উচ্চারণ

লাদাগাতিন-নাবিয়্যা ‘আকরাবুন ওয়া হুয়া ইউসাল্লী। ফালাম্মা ফারাগা ক্বালা: লা‘আনাল্লাহুল-‘আকরাবা, লা তাদা‘উ মুসাল্লিয়ান ওয়া লা গাইরাহু। ছুম্মা দা‘আ বিমিলহিন ওয়া মা-ইন, ফাজা‘আলাহু ফী ইনা-ইন। ছুম্মা জা‘আলা ইয়াসুব্বুহু ‘আলা ইসবিহিহি হাইছু লাদাগাতহু, ওয়া ইয়ামসাহুহা, ওয়া ইউ‘আউয়িযুহা বিল-মু‘আউয়িযাতাইন।

বাংলা অর্থ

আলী (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ নামাজরত অবস্থায় একটি বিচ্ছু তাঁকে দংশন করল। নামাজ শেষ করার পর তিনি বললেন, “আল্লাহ বিচ্ছুটির ওপর লানত করুন; এটি কোনো নামাজরত ব্যক্তি বা অন্য কাউকে ছাড়ে না।” এরপর তিনি পানি ও লবণ আনালেন এবং তা একটি পাত্রে রাখলেন। তারপর দংশিত আঙুলের স্থানে সেই পানি ঢালতে লাগলেন, সেটি মুছতে লাগলেন এবং তার ওপর মু‘আউয়িযাতাইন (সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস) দ্বারা রুকইয়াহ করতে লাগলেন।

দলিল

গ্রন্থ: আত-তিব্বুন নববী — আবু নু‘আইম আল-ইসফাহানি
বর্ণনা: ৫৭২
অধ্যায়: باب في لدوغ الهوام — বিষাক্ত প্রাণীর দংশন সম্পর্কিত অধ্যায়।

একই গ্রন্থে ৫৭১ নম্বর বর্ণনাতেও পানি ও লবণ ব্যবহারের বর্ণনা রয়েছে।

দলিল: আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। আল-মু‘জাম আস-সাগীর (তাবারানি), হাদিস ৮৩০; আল-হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৫/১১৪—সনদ হাসান; শাইখ আল-আলবানি, হিদায়াতুর রুওয়াত, হাদিস ৪৪৯১সহিহ

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

এই হাদিস ইসলামের চিকিৎসা-নীতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ইসলাম রোগকে অস্বীকার করে না, আবার চিকিৎসাকেও অবহেলা করতে শেখায় না। বরং রোগ হলে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা, রোগের কারণ অনুসন্ধান করা এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখা—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে ধারণ করতে শিক্ষা দেয়।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও মনে করে যে, রোগ প্রতিরোধ, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা (Evidence-Based Medicine) মানুষের সুস্বাস্থ্য রক্ষার মৌলিক ভিত্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) স্বাস্থ্যকে কেবল রোগের অনুপস্থিতি নয়, বরং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার পূর্ণাঙ্গ অবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এই ধারণা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং যথাসময়ে চিকিৎসা গ্রহণের গুরুত্বকে বিশেষভাবে সমর্থন করে।

তথ্যসূত্র: World Health Organization (WHO), Constitution of the World Health Organization (Health Definition); Evidence-Based Medicine Working Group, JAMA (1992).

এই গ্রন্থ তিব্বে নববী রাসুল ()-এর চিকিৎসা পদ্ধতি কোনো লোকজ চিকিৎসার সংকলন নয়, কোনো অলৌকিক দাবিনির্ভর বইও নয়। এটি কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নির্দেশনা, স্বাস্থ্যরক্ষা, রোগ প্রতিরোধ, খাদ্যাভ্যাস, পরিচ্ছন্নতা এবং চিকিৎসা গ্রহণের ইসলামী নীতিমালাকে গবেষণাভিত্তিক, দলিলনির্ভর ও ব্যবহারিক রূপে উপস্থাপনের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা।

এই গ্রন্থে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ হবে মূল ভিত্তি। নির্ভরযোগ্য আহলুস সুন্নাহর আলিমদের ব্যাখ্যা হবে সঠিক বোঝাপড়ার মাধ্যম। আর আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা ব্যবহার করা হবে বিষয়গুলোর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যার সহায়ক হিসেবে—কখনোই কুরআন ও সুন্নাহর বিকল্প হিসেবে নয়।

আমরা মহান আল্লাহ তাআলার নিকট দোয়া করি, তিনি যেন এই প্রচেষ্টাকে কবুল করেন, এতে বরকত দান করেন এবং এই গ্রন্থকে মানুষের জন্য হিদায়াত, সঠিক চিকিৎসা-জ্ঞান ও কল্যাণের একটি উপকারী মাধ্যম বানিয়ে দেন।

وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ ۚ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ

অর্থ: আমার সাফল্য একমাত্র আল্লাহরই সাহায্যে আমি আল্লাহর উপরই ভরসা করি এবং আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন করি
সূরা: হূদ, আয়াত ৮৮।