কুরআন মাজীদ আল্লাহ রব্বুল আলামিনের পবিত্র কালাম। এটি কোনো মানুষের রচিত গ্রন্থ নয়; এটি মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নাজিলকৃত হিদায়াত, সত্য, জ্ঞান ও কল্যাণের কিতাব। কুরআন মাজীদের প্রতিটি আয়াত, প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি বক্তব্যের মধ্যে এমন গভীরতা, ব্যাপকতা, সূক্ষ্মতা, মর্মার্থ, হিকমত, শিক্ষা ও তাৎপর্য নিহিত রয়েছে, যা মানুষের সীমিত জ্ঞান, সীমিত ভাষা ও সীমিত উপলব্ধির পরিসরের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করা সম্ভব নয়। কুরআন মাজীদের মূল ভাষা আরবি; আর এই আরবি ভাষার প্রতিটি শব্দ এমন গভীর ও ব্যাপক অর্থ বহন করতে পারে, যার সমস্ত দিক অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদ করার মাধ্যমে হুবহু ও পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করা কখনোই সম্ভব নয়।

একটি আরবি শব্দের মধ্যে কখনো এমন একাধিক অর্থ, সূক্ষ্মতা, ইঙ্গিত ও মর্ম নিহিত থাকে, যার সবটুকু প্রকাশ করার জন্য অন্য ভাষায় একাধিক শব্দ বা দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে। তারপরও অনুবাদের মাধ্যমে মূল আরবি শব্দের সমস্ত ব্যাপকতা, ভাষাগত সৌন্দর্য, শব্দচয়নের যথার্থতা এবং অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সম্পূর্ণরূপে তুলে ধরা সম্ভব হয় না। কারণ অনুবাদ যতই সুন্দর, নির্ভুল ও যত্নসহকারে করা হোক না কেন, অনুবাদ মূল কালামের একটি ভাষাগত প্রকাশ; মূল কালাম নিজে নয়। তাই কুরআন মাজীদের বাংলা অনুবাদকে কুরআন মাজীদের মূল আরবি কালামের পূর্ণ বিকল্প মনে করা যাবে না।

একইভাবে, রাসুলুল্লাহ -এর সহিহ হাদিস তাঁর পবিত্র বাণী ও সুন্নাহর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাদিসের মূল আরবি শব্দ, বাক্যবিন্যাস, বক্তব্যের সংক্ষিপ্ততা, শব্দ নির্বাচনের যথার্থতা এবং প্রসঙ্গের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যেও গভীর শিক্ষা, হিকমত ও তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। এসব বক্তব্য অন্য ভাষায় অনুবাদ করলে পাঠকের কাছে অর্থ সহজে পৌঁছে যায় এবং বক্তব্যের মূল শিক্ষা বোঝা সম্ভব হয়; কিন্তু মূল আরবি বাণীর প্রতিটি শব্দের পূর্ণ ব্যাপকতা, সূক্ষ্মতা ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুবাদের সীমিত শব্দের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না।

এই কারণে এই বইয়ে কুরআন মাজীদের আয়াত ও রাসুলুল্লাহ -এর সহিহ হাদিসের যে বাংলা অর্থ উপস্থাপন করা হয়েছে, তা পাঠকের জন্য মূল আরবি বক্তব্যের অর্থ ও মর্ম বোঝার একটি সহায়ক মাধ্যম মাত্র। পাঠক যেন কখনো মনে না করেন যে, অনুবাদে ব্যবহৃত কয়েকটি বাংলা শব্দের মধ্যেই মূল আরবি বক্তব্যের সমস্ত অর্থ ও গভীরতা সম্পূর্ণরূপে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। বরং মনে রাখতে হবে, অনুবাদ আমাদের বোঝার পথ সহজ করে, কিন্তু মূল আরবি বক্তব্যের পূর্ণ ব্যাপকতাকে অন্য ভাষার শব্দের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে আবদ্ধ করতে পারে না।

এখানে একটি বিষয় অন্তরে গভীরভাবে ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি—কুরআন মাজীদের প্রতিটি আয়াত এবং রাসুলুল্লাহ -এর প্রতিটি সহিহ বাণী সত্য, হক, হিকমত ও কল্যাণে পরিপূর্ণ। আমরা আমাদের জ্ঞান, ভাষা ও উপলব্ধির সীমার মধ্যে যতটুকু বুঝতে পারি, তা আমাদের জন্য উপলব্ধ অর্থ; কিন্তু আমাদের সীমিত বোঝাপড়া কখনোই আল্লাহ তাআলার কালাম বা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহিহ বাণীর পূর্ণ অর্থের সীমা নির্ধারণ করতে পারে না। কোনো আয়াত বা হাদিসের কোনো দিক আমাদের কাছে সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট না হলেও, তার অর্থের কোনো অংশ আমাদের বোধের বাইরে থাকলেও, আল্লাহ তাআলার কালাম ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহিহ বাণীর সত্যতা, মর্যাদা, হিকমত ও কল্যাণের প্রতি আমাদের ঈমান, বিশ্বাস ও আস্থা অটুট থাকবে।

সুতরাং, এই বইয়ের বাংলা অনুবাদ পড়ার সময় পাঠককে সর্বদা মনে রাখতে হবে—আপনি যে অর্থটি পড়ছেন, তা মূল আরবি বক্তব্যের অর্থ বোঝার একটি মাধ্যম; এটি মূল আরবি বক্তব্যের পূর্ণ বিকল্প নয়। অনুবাদ আপনাকে অর্থের কাছে নিয়ে যাবে, কিন্তু মূল আরবি ভাষার প্রতিটি শব্দের গভীরতা, ব্যাপকতা ও সূক্ষ্ম তাৎপর্যকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করবে না। তাই কুরআন মাজীদের আয়াত ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহিহ হাদিসকে কখনো শুধু অনূদিত কয়েকটি শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখবেন না; বরং মূল আরবি বক্তব্যের প্রতি যথাযথ সম্মান, গভীর বিশ্বাস ও আস্থা রেখে অনুবাদকে অর্থ বোঝার সহায়ক মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করবেন।

আল্লাহ রব্বুল আলামিনের পবিত্র কালাম এবং রাসুলুল্লাহ -এর সহিহ বাণীর প্রতি আমাদের অন্তর পূর্ণ বিশ্বাস, সম্মান ও বিনয় নিয়ে নত থাকবে—আমরা যতটুকু বুঝতে পারি, ততটুকু বুঝে গ্রহণ করব; আর যা আমাদের সীমিত জ্ঞান ও উপলব্ধির বাইরে, সে বিষয়েও আল্লাহ তাআলার কালাম ও রাসুলুল্লাহ -এর সহিহ বাণীর সত্যতা ও হিকমতের প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখব।